শুক্রবার, ৩০-সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:২১ অপরাহ্ন

জীবন বীমার নিয়োগ: দুর্নীতি তদন্তে দুদক

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর, ২০২১ ০১:১৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সরকারি প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা কর্পোরেশনের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে যে প্রশ্নফাঁস ও ব্যাপক ঘুষ লেনদেন হয়েছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। জীবন বীমা কর্পোরেশনের মতিঝিলস্থ প্রধান কার্যালয়ে এ ব্যাপারে অভিযানও পরিচালনা করেছে দুদকের একটি টিম। দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটে আগত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক, সকেজা, ঢাকা-১ এর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী-এর নেতৃত্বে গত ১৩ সেপ্টেম্বর এ অভিযান পরিচালিত হয়। 
জীবন বীমা কর্পোরেশনের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ঘুষ লেনদেন ও প্রশ্নফাঁসের আগাম খবর প্রকাশ করেছিলো শীর্ষনিউজ ডটকম। গত ৩১ আগস্ট শীর্ষনিউজ ডটকমে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে তোলপাড় হয়। জীবন বীমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। কিন্তু তিনি যথাযথ জবাব দিতে পারেননি। তবে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে সেই পরিস্থিতিতেই নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করেন। কিন্তু অবশেষে শীর্ষনিউজ ডটকমে আগাম প্রকাশিত তথ্যই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর উচ্চমান সহকারীর ১৬২ পদের যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তাতে ১৬২ জন চাকরিপ্রার্থীর প্রায় সকলেই শতকরা প্রায় একশ’ ভাগ নম্বর পেয়েছেন, যা শুধু অস্বাভাবিকই নয় নজিরবিহীনও। এই ১৬২ জন চাকরিপ্রার্থীকে আগে থেকেই গোপনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন খোদ প্রতিষ্ঠানটির এমডি জহুরুল হক। যে কারণে পরীক্ষায় ৮০ নম্বরের মধ্যে ৮০ নম্বর পেয়েছেন এরা প্রায় সকলেই। উচ্চমান সহকারী পদের জন্য নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়া ১,৩২,২৯২ জন চাকরিপ্রার্থীর অন্যদের কেউ ৬০ এর বেশি নম্বর পাননি। এ ঘটনা ফাঁস হবার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। জীবন বীমা কর্পোরেশনের দুর্নীতিবাজ এমডিসহ সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং তাদের অপসারণ, গ্রেফতার ও পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা ইতিমধ্যে। 
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বরাবর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে। মো. মনিরুজ্জামান জোহা নামে জনৈক চাকরিপ্রার্থী লিখিত অভিযোগে এই নিয়োগ পরীক্ষাকে ‘প্রতারণার পরীক্ষা’ আখ্যায়িত করে পরীক্ষা বাতিল এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তিসহ এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আবেদন জানান। মনিরুজ্জামান জোহা উচ্চমান সহকারী পদের প্রার্থী ছিলেন। তার রোল নম্বর ১৩০-১৩৭৮১৫। “অভিনব পদ্ধতিতে জীবন বীমা কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জহুরুল হক লিখিত পরীক্ষার প্রায় ৮দিন পূর্বে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্ভাব্য চাকরিপ্রত্যাশীদের নিকট থেকে পিয়ন ৮ লক্ষ, নি¤œমান সহকারী ৯ লক্ষ এবং উচ্চমান সহকারী ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করে তিন লক্ষ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা প্রসঙ্গে” শিরোনামে উক্ত অভিযোগটি দেয়া হয়। 
গত ৫ সেপ্টেম্বর মো. মনিরুজ্জামান জোহা দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর এই অভিযোগপত্রটি দেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে দুদক এই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে দুদক টিম উক্ত অফিস সরেজমিন পরির্দশনপূর্বক পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তরপত্র এবং এ সংক্রান্ত কিছু রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, জীবন বীমা কর্পোরেশনের এই নিয়োগ পরীক্ষায় অগ্রিম প্রশ্নফাঁস, ৪০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ শীর্ষনিউজ ডটকম-এ আগাম প্রতিবেদন প্রকাশের পর মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরীক্ষা স্থগিতেরও দাবি উঠে। কিন্তু জীবন বীমার দুর্নীতিবাজ এমডি ঘুষের টাকায় মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে ‘প্রতারণার’ এই পরীক্ষার আয়োজন করেন। তিন ক্যাটাগরির মোট ৫১২টি পদের মধ্যে উচ্চমান সহকারীর ১৬২টি পদে পরীক্ষা হয় ৩ সেপ্টেম্বর এবং অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কের ৩৫০টি পদে পরীক্ষা হয় ৪ সেপ্টেম্বর। ৩ সেপ্টেম্বরের পরীক্ষার ফলাফল ওইদিন রাতেই চূড়ান্ত হয়। পরদিন ফলাফল জানাজানি হলে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। 
জীবন বীমা কর্পোরেশনে কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় গত বছর নভেম্বরে দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিত নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। কিন্তু এখন ওই নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আরো ভয়াবহ দুর্নীতি-প্রতারণা হয়ে গেলো। খোদ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহুরুল হক নিজেই এই দুর্নীতি-প্রতারণার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। 
জীবন বীমা কর্পোরেশনের এই নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র তৈরিসহ পরীক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করার কথা ছিলো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। ওই বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হয়েছে এবং চুক্তি অনুযায়ী তাদেরকে এজন্য অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রশ্নপত্র তৈরিও করেছিলো। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহুরুল হক তার তালিকার চাকরি প্রার্থীদের পাস করিয়ে দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি কড়া শর্ত আরোপ করেন। বিশ্ববিদ্যায়লটি তাতে রাজি না হওয়ায় তিনি নিজেই প্রশ্নপত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। এজন্য তার পছন্দের লোকদের দিয়ে একটি কমিটিও গঠন করেন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এমডি জহুরুল হক নিজের হাতে প্রশ্নপত্র তৈরি করে পরীক্ষার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই ৫১২ জনের কাছে বিলি করে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম ৮ লাখ, ৯ লাখ এবং ১০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এমডির এই নিয়োগ কেলেংকারির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়াও কর্মচারী নেতাদের একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী তিন ক্যাটাগরির এই পদের জন্য প্রথমে আলাদাভাবে সবার এমসিকিউ পরীক্ষা গ্রহণ করার কথা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর তারা উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদের এমসিকিউ উত্তীর্ণ প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা নেবে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষার খাতা প্রস্তুত, পরীক্ষার্থীদের হাজিরা শীট প্রস্তুত, পরীক্ষার কেন্দ্র ভাড়াকরণ, পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তরপত্র আনা নেয়ার জন্য পরিবহন ভাড়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সহায়তা গ্রহণ, সেবা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুতকরণ প্রভৃতি যাবতীয় কাজগুলো চুক্তি অনুযায়ী ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিরই করার কথা। এরজন্য তাদেরকে মোট ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ৪শ’ ৬৮ টাকা পরিশোধ করা হবে। এর একটি অংশ ইতিমধ্যে অগ্রিমও পরিশোধ করেছে জীবন বীমা কর্পোরেশন। 
চুক্তি অনুযায়ী পরীক্ষার যাবতীয় প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল গত বছর। ১৩ নভেম্বর, ২০২০ইং এই পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা ছিলো। কিন্তু পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে ১১ নভেম্বর, ২০২০ দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে কয়েকবার নিয়োগ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়ে উঠেনি। 
সূত্র জানায়, নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের ব্যাপারে গত প্রায় তিন মাস ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে এমডি জহুরুল হকের বৈঠক এবং দেনদরবার চলছিলো। জহুরুল হক প্রকাশ্য মিটিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এই মর্মে প্রস্তাব দেন যে, অন্য সবই ঠিক থাকবে। তবে তিনি ৫১২জন প্রার্থীর তালিকা দেবেন। পরীক্ষার পরে খাতাগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে এদেরকে পাস করিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি তাতে রাজি হয়নি। ফলে এমডি জহুরুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বরখেলাপ করে নিজেই নতুন করে প্রশ্নপত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। এ ব্যাপারে জীবন বীমা কর্পোরেশনের তার পছন্দের লোকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। কাগজে কলমে কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবে প্রশ্ন তৈরি করেন তিনি নিজের একক হাতে। সেই প্রশ্ন জীবন বীমা কর্পোরেশনের কর্মচারী নেতা নামধারী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গোপনে বিলি করে প্রার্থীদের কাছ থেকে গড়ে জনপ্রতি ৮ লাখ, ৯ লাখ, ১০ লাখ টাকা করে অগ্রিম হাতিয়ে নেন।  

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ প্রকাশিত)